দেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না পারলে জাতীয় অর্থনীতির বড় ধস ঠেকানো যাবে না বলে সতর্ক করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।
দেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকট যদি দ্রুত সমাধান করা না যায়, তবে জাতীয় অর্থনীতির চূড়ান্ত বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’ আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। সেমিনারে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা অংশ নিয়ে ব্যাংক খাতের লুটপাট ও উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
হোসেন জিল্লুর রহমানের চিহ্নিত করা ছয়টি বড় সমস্যা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গভীরতা বোঝাতে ছয়টি সুনির্দিষ্ট সংকটের কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো: ১. দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। ২. কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ নীতিমালার কারণে এই সংকট আরও ত্বরান্বিত হয়েছে, যা এখনো বিদ্যমান। ৩. সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের জমানো টাকা তুলতে না পেরে নীরবে চরম কষ্ট ভোগ করছেন। ৪. নতুন বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থান থমকে গেছে এবং বেকারত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ৫. বর্তমান সময়ের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোকে এই সংকট সমাধানের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। ৬. পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার টেকসই সংস্কারের জন্য একটি উচ্চ নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও আইনি সংস্কারের দাবি
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক ব্যাংক থেকে গ্রাহকেরা এখন টাকা তুলতে পারছেন না, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা অতীতে আর্থিক খাতে সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের পুনর্বাসনের জন্য কেন আইনের নতুন ধারা আনা হচ্ছে? সংকট দূর করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
‘থ্রিলার সিনেমার মতো ব্যাংক দখল’
সেমিনারে বিশেষ আলোচক হিসেবে ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনোভাবেই ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। বিগত দিনে যে পরিমাণ লুটপাট হয়েছে, তার হিসাব আলাদা করে ব্যাংকগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “বিগত সময়ে যেভাবে ব্যাংক দখল ও লুটপাট করা হয়েছে, তা কোনো থ্রিলার সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।” তিনি নিজেও ব্যাংক সংকটের কারণে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিলের আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে অংশ নেওয়া ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক ও পেশাজীবীরা অভিযোগ করেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে একসময় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে দেশের বড় বড় ইসলামী ব্যাংকগুলো দখল করা হয়েছিল। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোতে যদি নতুন করে কোনো অনিয়ম হয়, তবে এবার সাধারণ গ্রাহকেরাই রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

