ইরানের পালটা হামলার মুখে চরম অস্থিরতায় ভুগছে ইসরায়েল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষুব্ধ নাগরিকরা রাজপথে নেমে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করছেন, অনেকেই ছাড়ছেন দেশ।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে একাধিক যুদ্ধে জড়ালেও বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও অস্থির সময় পার করছে ইসরায়েল। গাজা ও লেবাননের পর ইরানের সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়ানোয় এবার দেশটির ভেতরেই তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন ফাটল। একদিকে ইরানের পালটা হামলার আতঙ্ক, অন্যদিকে জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়—সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন সাধারণ ইসরায়েলিরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু নাগরিক এখন নিজেদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য দেশ ছাড়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।
নেতানিয়াহু বিরোধী বিক্ষোভ ও যুদ্ধবিরতির দাবি
শনিবার (৪ এপ্রিল) তেল আবিবের রাজপথে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ এবং নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবি করেন। সামরিক সংঘাতের কারণে গণজমায়েতের ওপর সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও সাধারণ মানুষ তা উপেক্ষা করে রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে ‘বোমা নয়—আলোচনা করুন’ এবং ‘অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করুন’—এমন স্লোগান দেখা যায়। ইসরায়েলি মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পশ্চিম তীর ও গাজায় চলমান অভিযান সাধারণ ইসরায়েলিদের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলছে।
অর্থনৈতিক ধস ও জীবনযাত্রার দুর্বিষহ পরিস্থিতি
ইরানের সাথে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। প্রতিনিয়ত সাইরেন আর বাঙ্কারে কাটানো জীবন থমকে দিয়েছে স্বাভাবিক উৎপাদন। ফলে হু হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির দাম। রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধের পেছনে ইসরায়েলকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার খরচ করতে হচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। আয় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ইসরায়েলিদের মধ্যে চরম হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশত্যাগের হিড়িক ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে দেশ ছাড়ার এক অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, গত দুই বছরে প্রায় ১ লাখ ইসরায়েলি দেশত্যাগ করেছেন। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত ও পেশাদাররা যুদ্ধের এই বিভীষিকা থেকে বাঁচতে ইউরোপ বা আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছেন। বর্তমানে বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরে যেমন ভিড় বাড়ছে, তেমনি অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মিশর সীমান্ত ব্যবহার করছেন। যদিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, সংঘাত শুরুর পর ২০ হাজার ইহুদি দেশটিতে ফিরে এসেছেন, তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং অভ্যন্তরীণ এই গণবিক্ষোভ ইসরায়েলকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে আধিপত্যের দাবি করলেও, নিজেদের নাগরিকদের আস্থা হারানো নেতানিয়াহু প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

