বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের এই অবস্থানে কৌশলগত সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে চীন।
চীনের সঙ্গে বিভিন্ন বৈশ্বিক ও বাণিজ্যিক ইস্যুতে বাড়তি সুবিধা পেতে এবার তাইওয়ানকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক শীর্ষ বৈঠকের পর তাইওয়ানের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি (১৪ বিলিয়ন) ডলারের অস্ত্র সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের এই ব্যবসায়ীসুলভ অবস্থান তাইওয়ানকে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল করার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে আরও সহজ করে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অস্ত্র বিক্রি স্থগিত ও ট্রাম্পের ব্যবসায়িক কূটনীতি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাইওয়ানের অস্ত্র সরবরাহ তিনি আপাতত আটকে রেখেছেন এবং পুরো বিষয়টি এখন চীনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে বেইজিং তাদের বড় এক কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে। চীনের সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যে প্রচার শুরু করেছে যে, তাইওয়ানের সুরক্ষায় ওয়াশিংটন মোটেও কোনো নির্ভরযোগ্য ভরসার পাত্র নয়। এমনকি ট্রাম্প নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সমালোচনা করে বলেছেন, “কেউ হুট করে স্বাধীনতা চাইল আর আমরা ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে যাব, আমি এমনটা চাচ্ছি না।”
ইরান সংকট ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের এই নমনীয়তার পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বড় এক সমীকরণ। বিশেষ করে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করতে এবং ইরানকে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে বেইজিংয়ের প্রভাব কাজে লাগাতে চান ট্রাম্প। চীন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হরমুজ প্রণালি সচল রাখার পক্ষে হলেও, তারা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানের বিরুদ্ধে গিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেবে না বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
ট্রাম্প-শি চুক্তির অর্থনৈতিক লেনদেন
তাইওয়ান নীতিতে মার্কিন এই পরোক্ষ ছাড়ের বিপরীতে চীনের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থনৈতিক সুবিধাও আদায় করে নিয়েছেন ট্রাম্প। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, চীন আমেরিকার কাছ থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অন্তত ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং।
তাইওয়ানের অভ্যন্তরে উদ্বেগ ও তোলপাড়
ট্রাম্পের এই আকস্মিক অবস্থানে তাইওয়ানের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিভেদ দেখা দিয়েছে। দেশটির প্রধান বিরোধী দল ‘ন্যাশনালিস্ট পার্টি’র দাবি, বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে তাইওয়ানকে এক চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সাবেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা সু চি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের বড় ভাই যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো আমাদের আগলে রাখবে না।” তবে তাইওয়ানের বর্তমান সরকার ও ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন মিং-চি এই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, তাইওয়ানের নিরাপত্তায় আমেরিকার দেওয়া মূল প্রতিশ্রুতি এখনো আগের মতোই অটুট আছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই জটিল খেলায় তাইওয়ানকে ট্রাম্পের দাবার ঘুঁটি বানানো ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা নির্ভরযোগ্যতার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে। অস্ত্র সরবরাহের এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বেইজিংয়ের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

