শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং প্রাথমিক শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিএনপির চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সকলের সহায়তা কামনা করেছেন তিনি।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে গুলশানের বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্কের উন্মুক্ত পরিসরে ‘আমরা ভাবনায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় রিল-মেকিং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে তার পাশে ছিলেন কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। রিল-মেকিং প্রতিযোগিতার ১০ জন বিজয়ী তরুণ তারেক রহমানের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং তিনি উন্মুক্তভাবে সেগুলোর উত্তর প্রদান করেন।
আলাপচারিতায় তারেক রহমান নিজের পরিকল্পনা উপস্থাপন করে বলেন, “আমাদের সর্বপ্রথম একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, সেটি হলো আইনশৃঙ্খলা। মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকতে পারে, এটি নিশ্চিত করতে হবে। এবং যেভাবেই হোক দুর্নীতিকে মোকাবেলা করতে হবে। এই দুটি বিষয় যদি আমরা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারি, তবে অন্যান্য অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে।”
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে সরকারের অধীনে ১৩৮টি বিক্ষিপ্ত প্রকল্প চালু রয়েছে, যেখানে সম্পদের অপব্যয় ও দুর্নীতির সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, “আমরা এই পদ্ধতিকে পরিবার কেন্দ্রিক করতে চাই। আমাদের ফ্যামিলি কার্ড হবে সার্বজনীন। কৃষক, ভ্যানচালক অথবা চাকরিজীবী– সবার স্ত্রী এটি পাবেন। এতে দুর্নীতির সুযোগ হ্রাস পাবে।”
মূল্যবোধ শিক্ষা নিয়ে একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক শিশু তার বাবাকে সিট বেল্ট পরতে বাধ্য করেছিল কারণ তার শিক্ষক তাকে এটি শেখানো হয়েছিল। তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য শুধু তিন-চার তলা স্কুল ভবন নির্মাণ নয়, বরং বাজেট ব্যয় করে প্রাথমিক শিক্ষকদের আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করা। পাঠ্যক্রমে শিক্ষাগত বিষয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংযুক্ত করতে হবে। ছোটবেলা থেকে শিশুদের যদি ন্যায়-অন্যায় ও সঠিক-ভুলের পার্থক্য শেখানো যায়, তবে তারাই পরবর্তীতে সমাজের মূল্যবান অংশ হিসেবে দুর্নীতি ও সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধ প্রতিরোধ করবে।’
অনলাইনে হয়রানি বা সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তার চিন্তাভাবনা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল শিক্ষা, রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে কমিউনিটি ডেস্কের সাহায্যে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা যায়। এরপর তারেক রহমান একটি অভিনব ধারণার কথা জানান। তিনি বলেন, “সম্প্রতি একটি কুকুরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমাদের মর্মাহত করেছে। আমরা চিন্তা করছি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরে তিন-চারজন বন্ধুর একটি দল তৈরি করে কোনো একটি প্রাণী (যেমন– গরু, হাঁস, বিড়াল বা পাখি) লালনপালনের দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, যার ওপর তাদের মূল্যায়ন করা হবে। এতে শিশুদের মধ্যে মমতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে।” তিনি আরও জানান, ফেসবুকের অফিস বাংলাদেশে স্থাপনের বিষয়েও তাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকার যানজট সমাধানে তারেক রহমান তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঢাকার ৩ কোটি মানুষের চাপ কমাতে ময়মনসিংহ, মুন্সিগঞ্জ বা টাঙ্গাইলের মতো জেলা শহরগুলোতে ‘স্যাটেলাইট টাউন’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। রেলের গতি বৃদ্ধি করে এই শহরগুলোকে ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে যাতে মানুষ এক ঘণ্টায় যাতায়াত করতে পারে। এছাড়া ঢাকার ভেতরে মেট্রো রেলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর ‘মনোরেল’ চালুর সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তরুণদের ইন্টারনেট নির্ভরতা কমাতে এবং মেধা বিকাশে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রাখার ওপর জোর দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আমরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ক্রীড়া– এই চারটি মন্ত্রণালয়কে একটি দল হিসেবে কাজ করাব। বছরে ১২ মাসের মধ্যে ১০ মাস শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংগীত, আবৃত্তি ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রাখতে চাই। পড়াশোনাকে সহজ ও আনন্দময় করতে হবে যাতে তাদের মন অন্য নেতিবাচক বিষয়ে না যায়।”
বিজয়ী ১০ তরুণ– জাতীয় রিল-মেকিং প্রতিযোগিতার বিজয়ীরা হলেন তৌফিকুর রহমান, রাফায়েতুল আহমেদ রাবিত, শেখ রিফাত মাহমুদ, ফাতিমা আয়াত, মো. ইসরাফিল, শাজেদুর রহমান, শেখ মো. ইকরাতুল ইসলাম, যারিন নাজনীন, মো. রিফাত হাসান ও রমেসা আনজুম রোশমী।

