চলমান যুদ্ধ বন্ধে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ও জাহাজ থেকে টোল আদায়ের নতুন শর্ত দিয়েছে ইরান। এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক’ বলছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক শর্ত আরোপ করেছে ইরান। তেহরান এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দাবি করছে। একই সাথে এই নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলো থেকে নিয়মিত টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে দেশটি, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। দীর্ঘ দিন ধরেই ইরান এই পথকে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাণিজ্যে ব্যাপক মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের শর্তে পরিচালনার কৌশল গ্রহণ করেছে।
বিপুল আয়ের হাতছানি ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা বর্তমানে তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ। টোল আদায়ের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ইরানের মাসিক আয় মিসরের সুয়েজ খালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সিএনএনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি বড় তেলবাহী ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার ফি নিতে পারলে ইরানের মাসে আয় হবে ৮০ কোটি ডলারেরও বেশি। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, আন্তর্জাতিক জলপথে এমন খবরদারি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আইনি ভিত্তি ও বর্তমান সংকট
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর প্রথম ভাষণেই স্পষ্ট করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি অবরোধের এই সুযোগ ইরান কোনোভাবেই হাতছাড়া করবে না। যদিও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে এককভাবে টোল আদায়ের এই দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে এরই মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে যে, কিছু জাহাজ নিরাপদে পারাপারের জন্য ইরানকে গোপনে মোটা অঙ্কের অর্থ দিচ্ছে, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং একটি গভীর অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেহরানের এই নতুন শর্তে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

