আর্জেন্টিনার ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ের পূর্বে একটি কথা প্রায়ই শোনা যেত। আর্জেন্টিনার পরাজয় কিংবা খারাপ পারফরম্যান্সের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসত ‘মেসি একা কী করবেন!’
রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান অবস্থা দেখেও এখন একই কথা বলা যায়। শুধু কিলিয়ান এমবাপ্পে থাকবেন মেসির স্থানে এবং প্রশ্নটি হবে, এমবাপ্পে একা কী করবেন!
সরাসরি না বললেও সমস্যা নেই। পরিসংখ্যানই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে, রিয়ালের আশার একমাত্র ভরসা এখন এমবাপ্পে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে বেনফিকার বিপক্ষে সম্প্রতি রাতের ম্যাচটিই এর সবচেয়ে তাজা উদাহরণ। ৪–২ গোলে রিয়ালের পরাজয়ের সেই ম্যাচে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বাধিক শট (৪) ও ড্রিবলিং (৪) ছিল তাঁর। আক্রমণাত্মক এলাকায় সর্বোচ্চ ২২টি পাসও এসেছে তাঁর পা থেকে। আরদা গুলেরের (৬) পরে সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগও (৩) এমবাপ্পেই সৃষ্টি করেন এবং গোলও করেছেন শুধু এই ফরাসি তারকাই। এতটুকুতেই বোঝা যায়, এমবাপ্পে অন্তত প্রচেষ্টা করেছিলেন।
মৌসুমজুড়ে সেই প্রচেষ্টায় এমবাপ্পে যতটুকু সফল হয়েছেন, তাতে তাঁর সতীর্থরা কাছাকাছিও নেই। ২০২৫–২৬ মৌসুমে এ পর্যন্ত রিয়ালের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করুন ৩৩ ম্যাচে রিয়াল এ পর্যন্ত ৭৫ গোল করেছে, তার মধ্যে ২৯ ম্যাচ খেলে এমবাপ্পে একাই করেছেন ৩৬ গোল। গোলে রিয়ালের অন্য কেউ দুই অঙ্কেও পৌঁছাতে পারেননি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভিনিসিয়ুসের গোল ৭টি, জুড বেলিংহামের ৬টি।
লা লিগার এবারের মৌসুমে এখন পর্যন্ত এমবাপ্পেই সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০ ম্যাচে করেছেন ২১ গোল। রিয়ালের হয়ে এ প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় অন্য কাউকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। ২১ ম্যাচে ৫ গোল করা ভিনিসিয়ুস লা লিগায় এ মৌসুমে রিয়ালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সব দলের খেলোয়াড় মিলিয়ে গোলসংখ্যায় ২৩তম। পার্থক্যটা স্পষ্ট?
চ্যাম্পিয়নস লিগেও দেখতে পারেন। ৭ ম্যাচে ১৩ গোল নিয়ে এমবাপ্পে সেখানেও শীর্ষে। কিন্তু রিয়ালের অন্য কোনো খেলোয়াড়কে গোল করার এ তালিকায় খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। নামতে হবে শীর্ষ ৫০ গোলদাতারও নিচে ৭ ম্যাচে ২ গোল নিয়ে সেখানে আছেন বেলিংহাম (৫৪তম)।
এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মৌসুমে রিয়ালের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসর। লা লিগায় শীর্ষে থাকা বার্সার সঙ্গে ১ পয়েন্ট ব্যবধানে পিছিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রিয়াল। চ্যাম্পিয়নস লিগে অবস্থা আরও নাজুক। বেনফিকার কাছে সেই পরাজয়ে ছিটকে পড়তে হয়েছে শীর্ষ আট থেকে, শেষ ষোলোয়ে খেলতে উত্তীর্ণ হতে হবে প্লে অফের মধ্য দিয়ে। অথচ এ দুটি প্রতিযোগিতাতেই গোল করাটা নিয়মিত করে চলেছেন এমবাপ্পে। তবু রিয়ালকে প্রত্যাশিত জায়গায় সমর্থকদের না দেখার কারণ, বাকি খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে উজ্জ্বল হতে না পারা, গোল করতে না পারা।
অন্যভাবে বললে বলা যায়, এমবাপ্পে তাঁর সতীর্থদের ব্যর্থতা ঢাকতেই ম্যাচের পর ম্যাচে গোল করে চলেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত রিয়ালের মোট গোলের ৪৮ শতাংশই এমবাপ্পের। একজন খেলোয়াড় যখন একাই দলের প্রায় অর্ধেক গোল করেন, তখন ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই কাজ করে। ইতিবাচক দিকটি হলো এমবাপ্পে দলের হয়ে মাঠে তার সর্বস্ব ঢেলে দিচ্ছেন। নেতিবাচক দিকটি হলো তাঁর এ সাফল্যের কারণে অন্যদের ব্যর্থতা আরও প্রকটভাবে চোখে পড়ছে। অর্থাৎ, রিয়ালের দলীয় পারফরম্যান্সে সামঞ্জস্য নেই। বার্সা একসময় যেমন কেবল লিওনেল মেসির ওপর নির্ভরশীল ছিল, রিয়ালের পরিস্থিতি এখন ঠিক তা–ই। কিন্তু প্রশ্ন হলো একজন একটি দলকে কত দিন টেনে নিয়ে যেতে পারেন?
তাই সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই প্রশ্নও উঠছে, রিয়ালে এমবাপ্পে একা কী করবেন?

