তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। শিল্প ও কৃষি খাতের ওপর জ্বালানি সংকটের বহুমুখী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার (ডিসিসিআই)।
দেশে চলমান জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল, ২০২৬) মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য জানান সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক এই আলোচনায় শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়।
শিল্প ও ব্যবসা খাতে ব্যয়ের পাহাড়
ডিসিসিআই সভাপতির উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, কেবল পোশাক খাত নয়, বরং সিমেন্ট, স্টিল ও ওষুধ শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের সংকটে সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ব্যাগে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। লজিস্টিক ও পরিবহন খরচ বাড়ায় কন্টেইনার প্রতি অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। স্টিল ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতেও খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তাদের ৪৫ শতাংশই জ্বালানি সংকটকে ব্যবসার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জীবনযাত্রায় সংকটের আঘাত ও কৃষি খাত
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও হুমকির মুখে। ডিসিসিআই-এর তথ্যমতে, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তাদের মোট আয়ের ২২ শতাংশই ব্যয় করতে হচ্ছে জ্বালানি খাতে। অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা আকাশচুম্বী। কৃষি খাতে ডিজেলে ১৭.৬৫ শতাংশ এবং সার আমদানিতে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। কোল্ড চেইন বা যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
সংকট মোকাবিলায় ঢাকা চেম্বারের প্রস্তাবনা
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিসিসিআই বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে:
- উৎস বহুমুখীকরণ: মালয়েশিয়া বা ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর সাথে জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি এবং দীর্ঘমেয়াদী পেমেন্ট সুবিধার জন্য আলোচনা করা।
- সাশ্রয়ী নীতি: দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এসি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা।
- শিল্পে অগ্রাধিকার: জাতীয় অর্থনীতি সচল রাখতে রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- অবকাঠামো সংস্কার: তিতাস ও বাখরাবাদের পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার করে সিস্টেম লস কমানো এবং জাতীয় জ্বালানি মজুত বাড়াতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করা।
- বিকল্প শক্তি: ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করা এবং নেপাল-ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প খাতের চাকা সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

